অসমাপ্ত ভালোবাসা -একটি অসাধারণ ভালোবাসার গল্প
অনেকদিন থেকেই তূর্য আঞ্জুমের প্রেমে পাগল প্রায়। যদিও তা একতরফা, তবু তূর্য জানে ওর পাগলামীটা কিছুটা হলেও আঞ্জুম বুঝতে পারে। দু'জনই একই কলেজে পড়ে, তবে ছেলে মেয়েদের ক্লাস আলাদা। তাই দেখা যা হওয়ার ছুটির পর অথবা ব্রেক টাইমে হয়। ওর দেখা পেতে তূর্যর কম কাঠখড় পোড়াতে হয়না!
সেই দেড়টা থেকে গেইটে সবার চোখের আড়ালে থেকে অপেক্ষা করা, কখন সে বের হবে আর তাকে একনজর দেখবে। সেই দেখাও একটু চোখাচোখি আর স্মীত হাসিতে শেষ। একদিন সাহস করে সে আঞ্জুমের পিছু নেয়, বাসার ঠিকানাটা জানলে অন্তত কিছুটা হলেও লাভ হবে। ছুটির পর আঞ্জুম তার বান্ধবির সাথে যাচ্ছে হেঁটে হেঁটে, পিছু পিছু তূর্য আর মামুন। কিন্তু ওরা হাঁটছে তো হাঁটছেই, নিউমার্কেট থেকে হাঁটতে হাঁটতে নিমতলি, তবু দু'জন আর থামে না।
ওদিকে তূর্যর সাথে এসে মামুন চরম বিরক্ত, তবু বন্ধুর প্রেমিকা বলে কথা, তাই চলেও যেতে পারছে না। অবশেষে মেয়ে দুইটা গণেশতলার গলিতে গিয়ে থামল। দূর থেকে বাসা দেখে তূর্য আর মামুন ফিরে আসলো সেবারের মতো। দু'জনই এতটা হেঁটে চরম ক্লান্ত, মামুন তো বলেই দিল, মাম্মা এই মেয়ে তোর বউ হলে বিরাট ভাগ্যবান হবি তুই। অবাক হয়ে তূর্য বলে কেমনে ব্যাটা? প্রথমেই এত হাঁটতে হচ্ছে, পরে না জানি কি হবে! মামুন উচ্চস্বরে বলে ওঠে আরেহ ব্যাটা, এই মেয়ে বউ হলে তোর টাকা জমতে জমতে সুইস ব্যাংকে কয়েকটা একাউন্ট খুলতে পারবি, হা হা হা।
পরদিন ছুটির পর আঞ্জুম দাঁড়িয়ে আছে। তূর্য এগিয়ে গিয়ে একটা রিকশা ডেকে ঠিকানা বলে ভাড়াটা দিয়ে বলে সামনের ঐ আপাদের নিয়ে যাও। রিক্সাওয়ালা দন্ত বিকশিত করে এমন একটা ভাব দেখালো যেন বিরাট একটা কিছু আবিষ্কার করে ফেলছে। কলোম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার এর পর ও মনে হয় খুশিতে এতোগুলো দাঁত বের করে নাই। বলে জী ভাইজান বুইজ্যা ফালাইছি। আঞ্জুম তূর্যকে দেখেছে রিক্সা ঠিক করতে তাই আর কিছু বলেনা, ঐ রিক্সাতেই যায়। তারও কয়েকদিন পর তূর্য ভাবে এভাবে আর কতদিন, অন্তত মনের কথাটা বলে দেয়া উচিত। তা ভেবেই সে মনস্থির করে পরদিনই কলেজে গিয়ে আঞ্জুমকে প্রপোজ করবে। যথারীতি দেখা হয় পরদিন, সব দ্বিধা ভুলে তূর্য কথা বলে প্রথমবারের মতো-
'আমি কি আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?'
'জী বলেন।'
'এখানে না, একটু যদি সামনে যেতেন। আসলে আমার তো সময় নেই, আচ্ছা তবু আপনি যখন বলছেন!' সাথের বান্ধবিদের আসছি বলে এগিয়ে যায় ওরা। হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথাই হয় তাদের যদিও সব ফর্মাল টাইপ। মোড়ের ফুলের দোকান থেকে লাল টকটকে কয়েকটা গোলাপ কিনে এগিয়ে দেয় তূর্য আঞ্জুমের হাতে। গোলাপগুলো হাতে নিয়ে আঞ্জুম মুচকি হেসে বলে তা ফুল কেনো? তূর্য কী যেন একটা বলতে যাবে তখনই দূর থেকে আঞ্জুমের বান্ধবীরা হেসে বলে কি রে আঞ্জুম আর কত সময় নিবি? কতক্ষণ আর!
তুর্য বলে, আপনার মনে হয় অনেক বেশি তাড়া আছে। আজ না হয় থাক। অন্য কোন দিন কথা হবে। যদি ও তুর্যর ইচ্ছা যে আজই তার মনের কথা গুলো বলে দিবে। তারপরে যা হওয়ার হবে। আঞ্জুম বলে যে, সমস্যা নেই, আপনি বলতে পারেন। তুর্য কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে হঠাৎ করেই সব পরিকল্পনা পরিবর্তন করে বলে আসলে আমি সরি। তোমার সময় নষ্ট করলাম। তুমি অনেক ভাল একটা মেয়ে, আমার চেয়ে আরো ভাল কাউকে তুমি পাবে। অনেক ভাল কাউকে তুমি ডিসার্ভ কর। ভাল থেকো আঞ্জুম, বলেই তূর্য দ্রুত চলে যায়। আর হাতের ফুলগুলো নিয়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে আঞ্জুম!
বুকের মধ্যে সমস্ত কষ্ট চেপে তুর্য তার জীবনের অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। চোখে পানি চলে এসেছিল, কোন রকমে সেটা লুকিয়ে মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে রাস্তায় হাঁটছে। যুদ্ধে নিশ্চিত জয় জেনে আজ সে পরাজিত সৈনিক।
শেষ মুহূর্তে এসে তূর্য বাস্তবতার কাছে নিজের আবেগ এবং ভালোবাসাকে জয়ী করতে পারেনি, হঠাৎই তার মনে হল তার এটা করা একদম ঠিক হবেনা, এই মেয়েটা তার কারণে হয়তো আজীবন কষ্ট পাবে। তার বান্ধবীরা এখন যেমন হাসছে তখন কটাক্ষের হাসি হেসে বলবে, এমন একটা ছেলের সাথে প্রেম করলি যার কিছুই নেই! হয়তো আঞ্জুম তাকে নিয়ে অনেক সুখী হতে পারবে না। এই অপরাধবোধ থেকেই তূর্যর সরে আসা। সাময়িক মোহের কারণে কিংবা ভালোবাসার কারণে একটা মেয়ের অপবাদের বা কষ্টের কারণ সে হতে চায় না। সব দিক ঠিক রেখেই সে কাউকে চায়, জীবনের সব দিক এলমেলো রেখে না।
মামুন বলে ধুর তুই কি করলি এটা!!! সব কিছুই তো ঠিক ছিল। এই রকম সুযোগ কি কেউ হাতছাড়া করে নাকি? তুর্য বলে আরে ব্যাটা সে আমার দেয়া ফুল নিয়েছে, এটাই তো আমার পাওয়া। আমি বললে হয়তো সেও আমাকে ভালবাসতো, ওর চোখই তখন তা বলেছে, কিন্তু পরে কি হতো? আমার ক্যারিয়ার গোছানোর আগেই তার বিয়ে ঠিক হয়ে যেত, তখন কিছুই করতে পারতাম না। এর চেয়ে এই ভাল, চলে যাওয়ার আগেই ফিরে আসা। অনেকটা পথ একসাথে চলার পরে হঠাৎ একা একা বাকিটা পথ চলা অনেক কঠিন। ফুলগুলো দেখেই সে হয়ত ভাববে তার জীবনে এমন কেউ ছিল যে ভালোবাসি বলতে গিয়ে বলেনি, এটা ভেবেই সে সান্তনা পাবে। পেয়ে হারানোর যন্ত্রনাটা অনেকেই সহ্য করতে পারেনা। ঘুরে ফিরে দোষ দেয় নিজেদেরই। আমি তাকে সে সুযোগ আর দিলাম না, থাকি না তার একজন শুভাকাংখী হয়ে! আর সবার চোখে সব স্বপ্ন দেখা মানায় না। কিছু কিছু স্বপ্ন দেখার জন্য উপরওয়ালার অনুমতি লাগে। যেটা সবার থাকে না।
অবাক হয়ে মামুন বলে তুই আসলেই অদ্ভুত দোস্ত। জগতে এমন অনেক অদ্ভুত ছেলেই হয় তূর্যর মতন.......যারা মনে করে যে ভালো লাগার মানুষটাকে ভালো রাখার নামই ভালোবাসা। কিছু না পাওয়ার মাঝে ও তারা অনেক কিছু পাওয়ার সুখ খুঁজে ফিরে। এই মানুষগুলোর শুধু ভালোবাসার অধিকার আছে কিন্তু ভালোবাসা পাবার অধিকার নাই.....!!!!!!




No comments